পাঠ ও মস্তিষ্ক

গোল্ডফিশের চেয়েও কম মনোযোগ? একটি জনপ্রিয় মিথের ময়নাতদন্ত ও আসল সত্য

"মানুষের মনোযোগ আট সেকেন্ড" — এই দাবি কোথা থেকে এলো, কেন তা ভুল, আর গ্লোরিয়া মার্কের গবেষণা পর্দার সামনে আমাদের মনোযোগ নিয়ে আসলে কী বলছে।

গোল্ডফিশের চেয়েও কম মনোযোগ? একটি জনপ্রিয় মিথের ময়নাতদন্ত ও আসল সত্য
"মানুষের মনোযোগ আট সেকেন্ড" — এই দাবি কোথা থেকে এলো, কেন তা ভুল, আর গ্লোরিয়া মার্কের গবেষণা পর্দার সামনে আমাদের মনোযোগ নিয়ে আসলে কী বলছে।
এই লেখায় যা আছে
  1. মিথটি কোথা থেকে এলো
  2. "মনোযোগের স্থায়িত্ব" মাপা এত কঠিন কেন
  3. তাহলে আসল সত্যটা কী?
  4. বিক্ষেপের লুকানো মূল্য
  5. মনোযোগের অবশেষ
  6. পকেটের ফোনও মনোযোগ কাড়ে
  7. মনোযোগ ফিরিয়ে আনার বৈজ্ঞানিক কৌশল
  8. বই: মনোযোগের প্রশিক্ষণশালা
  9. শেষ কথা
  10. তথ্যসূত্র

নিশ্চয়ই শুনেছেন কথাটি: "মানুষের মনোযোগের স্থায়িত্ব এখন মাত্র আট সেকেন্ড — গোল্ডফিশের নয় সেকেন্ডের চেয়েও কম।" সংবাদমাধ্যম, সেমিনার, বিপণন কর্মশালা — সবখানে এই "তথ্য" ঘুরে বেড়িয়েছে বছরের পর বছর।

সমস্যা একটাই: দাবিটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই ভুল। আর এর ভুল হওয়ার গল্পটি আমাদের মনোযোগ সম্পর্কে আসল সত্যের চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়।

মিথটি কোথা থেকে এলো

২০১৫ সালে মাইক্রোসফট কানাডার বিজ্ঞাপন বিভাগের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০০০ সালে মানুষের গড় মনোযোগ ছিল ১২ সেকেন্ড, আর ২০১৩ সালে তা নেমে এসেছে ৮ সেকেন্ডে। পাশে তুলনা হিসেবে দেওয়া হয় গোল্ডফিশের "নয় সেকেন্ড"।

বিশ্বের বড় বড় সংবাদমাধ্যম লুফে নেয় শিরোনামটি। কিন্তু পরবর্তীতে সাংবাদিক ও গবেষকেরা যখন উৎস খুঁজতে যান, তখন বেরিয়ে আসে বিস্ময়কর তথ্য:

  • সংখ্যাগুলো মাইক্রোসফটের নিজস্ব গবেষণা থেকে আসেনি; এসেছিল একটি তৃতীয় পক্ষের পরিসংখ্যান ওয়েবসাইট থেকে।
  • সেই ওয়েবসাইট কোনো মূল গবেষণাপত্রের উল্লেখ দিতে পারেনি।
  • ব্রিটিশ সম্প্রচার সংস্থা বিবিসির একটি পরিসংখ্যান-যাচাই অনুষ্ঠানসহ একাধিক বিশেষজ্ঞ দাবিটিকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন।
  • আর গোল্ডফিশ? বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, গোল্ডফিশ কয়েক মাস পর্যন্ত শেখা বিষয় মনে রাখতে পারে।

একটি সংখ্যা যত নাটকীয়, তার উৎস যাচাই করা তত জরুরি।

"মনোযোগের স্থায়িত্ব" মাপা এত কঠিন কেন

মনোবিজ্ঞানীরা একটি মূল সমস্যার কথা বলেন: মনোযোগ কোনো একক, স্থির সংখ্যা নয়। একই মানুষ একটি বিরক্তিকর সভায় দুই মিনিটও মন দিতে পারেন না, অথচ প্রিয় উপন্যাসে তিন ঘণ্টা ডুবে থাকেন। মনোযোগ নির্ভর করে কাজের ধরন, আগ্রহ, ক্লান্তি, পরিবেশ — অসংখ্য বিষয়ের ওপর।

তাই "মানুষের মনোযোগ আট সেকেন্ড" জাতীয় একটি সংখ্যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রায় অর্থহীন।

তাহলে আসল সত্যটা কী?

মিথ ভুল হলেও উদ্বেগটি অমূলক নয়। এখানেই আসে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আরভাইনের তথ্যবিজ্ঞানী গ্লোরিয়া মার্কের দুই দশকের গবেষণা — যা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য, এবং অনেক বেশি চিন্তার খোরাক জোগায়।

মার্ক ও তাঁর দল মানুষের আসল কর্মপরিবেশে কম্পিউটার-পর্যবেক্ষণ সফটওয়্যার ব্যবহার করে মেপেছেন, কেউ একটি পর্দায় কতক্ষণ থাকেন অন্য কিছুতে যাওয়ার আগে। ফলাফল:

সময়কাল একটি পর্দায় গড় মনোযোগ
২০০৪ সালের গবেষণা প্রায় আড়াই মিনিট
২০১২ সালের গবেষণা প্রায় ৭৫ সেকেন্ড
সাম্প্রতিক বছরগুলো প্রায় ৪৭ সেকেন্ড

মার্ক নিজে স্পষ্ট করেছেন, এটি একই মানুষদের দীর্ঘমেয়াদি অনুসরণ নয়, বিভিন্ন সময়ের ভিন্ন ভিন্ন গবেষণার ফল। তবে অন্য গবেষকেরাও কাছাকাছি সংখ্যা পেয়েছেন — কেউ ৪৪, কেউ ৫০ সেকেন্ড।

অর্থাৎ, সমস্যাটি আমাদের মস্তিষ্কের জৈবিক ক্ষমতায় নয় — সমস্যা আমাদের অভ্যাস ও পরিবেশে। আমরা মনোযোগ দিতে পারি না, তা নয়; আমরা বারবার মনোযোগ ভাঙার পরিবেশে বাস করি।

বিক্ষেপের লুকানো মূল্য

প্রতিবার একটি কাজ থেকে অন্য কাজে যাওয়া নির্দোষ মনে হয়। কিন্তু গবেষণা বলছে, এর একটি মূল্য আছে।

মনোযোগের অবশেষ

মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা-গবেষক সোফি লেরয় ২০০৯ সালে একটি ধারণা দেন, যার নাম "মনোযোগের অবশেষ" (Attention Residue)। যখন আমরা একটি কাজ শেষ না করে অন্য কাজে যাই, তখন আগের কাজের চিন্তার একটি অংশ মনে থেকে যায়। ফলে নতুন কাজে আমরা পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারি না।

বই পড়ার মাঝে একবার বার্তা দেখলেন — চোখ বইয়ে ফিরে এলেও, মনের একটি অংশ তখনো সেই বার্তার উত্তর নিয়ে ভাবছে।

পকেটের ফোনও মনোযোগ কাড়ে

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাড্রিয়ান ওয়ার্ড ও সহকর্মীরা ২০১৭ সালে প্রায় ৮০০ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর একটি পরীক্ষা চালান। তাঁদের তিন দলে ভাগ করা হয় — কারও ফোন টেবিলে (উল্টো করে, নীরব), কারও পকেটে বা ব্যাগে, আর কারও ফোন অন্য ঘরে।

ফলাফল: যাঁদের ফোন অন্য ঘরে ছিল, তাঁরা মনোযোগ ও কার্যকর স্মৃতির পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো করেছেন — যদিও কারও ফোনই বাজেনি বা কেউ ফোন ব্যবহার করেননি। শুধু ফোনের উপস্থিতিই মস্তিষ্কের একটি অংশ ব্যস্ত রাখে, যাতে সে ফোনটিকে উপেক্ষা করতে পারে।

মনোযোগ ফিরিয়ে আনার বৈজ্ঞানিক কৌশল

গ্লোরিয়া মার্ক নিজে "মনোযোগের স্থায়িত্ব বাড়ানো"-র চেয়ে "মানসিক শক্তির ভারসাম্য" রক্ষার ওপর জোর দেন। তাঁর গবেষণা ও অন্যান্য প্রমাণ থেকে কিছু কৌশল:

  1. ফোন দূরে রাখুন, শুধু নীরব নয়। ওয়ার্ডের গবেষণা অনুযায়ী ভৌত দূরত্বই আসল সমাধান।
  2. একটি কাজ শেষ করে পরেরটি। মনোযোগের অবশেষ কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায়।
  3. পরিকল্পিত বিরতি নিন। মার্কের মতে, মন ঘুরে বেড়ানোর মতো হালকা কাজ — হাঁটা, জানালা দিয়ে তাকানো — মানসিক শক্তি পুনরুদ্ধার করে।
  4. গভীর কাজের জন্য সময় বাঁধুন। দিনের সবচেয়ে সতেজ সময়টুকু পড়া বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য রাখুন।
  5. নিজের বিক্ষেপ লক্ষ করুন। মার্কের গবেষণায় দেখা গেছে, বাইরের বিজ্ঞপ্তির মতোই প্রায় সমান সংখ্যক বিক্ষেপ আসে নিজের ভেতর থেকে — হঠাৎ কিছু দেখার ইচ্ছা থেকে।

বই: মনোযোগের প্রশিক্ষণশালা

এই পুরো আলোচনায় বই একটি বিশেষ জায়গা নেয়। একটি ছাপা বই বা বিজ্ঞপ্তিহীন ই-রিডার এমন একটি বিরল পরিবেশ, যেখানে:

  • কোনো লিংক আপনাকে অন্য পাতায় টেনে নেয় না।
  • কোনো অ্যালগরিদম পরের বিষয় ঠিক করে না।
  • গতি নির্ধারণ করেন আপনি নিজে।

প্রতিবার একটি অধ্যায় বিক্ষেপ ছাড়া শেষ করা মানে মস্তিষ্ককে মনোযোগের একটি ছোট প্রশিক্ষণ দেওয়া।

শেষ কথা

আমরা গোল্ডফিশ নই। আমাদের মস্তিষ্ক এখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটি বিষয়ে ডুবে থাকতে সক্ষম — ইতিহাসের প্রতিটি মহৎ গ্রন্থ, প্রতিটি আবিষ্কার তার প্রমাণ। কিন্তু সেই ক্ষমতা ব্যবহার না করলে তা দুর্বল হয়ে পড়ে। ভুল মিথ বিশ্বাস করে হাল ছেড়ে না দিয়ে, আসল বিজ্ঞান মেনে নিজের মনোযোগকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমাদেরই।

তথ্যসূত্র

  • মার্ক, গ্লোরিয়া — অ্যাটেনশন স্প্যান (২০২৩) ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আরভাইন
  • লেরয়, সোফি — "মনোযোগের অবশেষ" বিষয়ক গবেষণা (২০০৯)
  • ওয়ার্ড ও সহকর্মী — "ব্রেইন ড্রেইন", জার্নাল অব দ্য অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজিউমার রিসার্চ (২০১৭)
  • মাইক্রোসফট কানাডা বিজ্ঞাপন প্রতিবেদন (২০১৫) ও পরবর্তী সাংবাদিক-যাচাই

ট্যাগ:মনোযোগডিজিটাল জীবনমস্তিষ্ক ও বিজ্ঞান

লেখাটা ভালো লাগলে একটা ভালোবাসা দিয়ে যান