এই লেখায় যা আছে
পৃথিবীতে খুব কম জাতি আছে, যাদের একটি মাসব্যাপী উৎসব গড়ে উঠেছে শুধু বইকে কেন্দ্র করে। আর তার চেয়েও কম জাতি আছে, যাদের সেই উৎসবের শিকড় প্রোথিত মাতৃভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ইতিহাসে।
বাংলাদেশের অমর একুশে গ্রন্থমেলা এমনই এক বিরল সাংস্কৃতিক ঘটনা। এর গল্প শুধু একটি মেলার গল্প নয় — এটি একটি জাতির পরিচয়, ভাষাপ্রেম ও জ্ঞানতৃষ্ণার গল্প।
শিকড়: ভাষার জন্য সংগ্রাম
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে রাজপথে নামে। পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। মাতৃভাষার জন্য এমন আত্মত্যাগ বিশ্ব-ইতিহাসে বিরল।
এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি আসে প্রায় অর্ধশতাব্দী পর। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, এবং ২০০০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
একটি মাদুর, কয়েকটি বই
স্বাধীনতার পরের বছর, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা একটি অনন্য কাজ করেন। বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে, বর্ধমান হাউসের সামনে একটি আমগাছের নিচে তিনি একটি চট বা মাদুর বিছিয়ে তাঁর প্রকাশনা সংস্থা "মুক্তধারা"-র প্রায় ৩২টি বই সাজিয়ে বসেন।
বইগুলোর বেশিরভাগই ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে শরণার্থী লেখকদের লেখা। এই ছোট্ট উদ্যোগটিই ছিল আজকের বিশাল বইমেলার বীজ।
বিবর্তনের ধারা
| সময় | ঘটনা |
|---|---|
| ১৯৫২ | ভাষা আন্দোলন ও একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগ |
| ১৯৭২ | চিত্তরঞ্জন সাহার মাদুরে বই সাজিয়ে বসা |
| ১৯৭৪–৭৬ | মুক্তধারার প্রথম স্টল; ধীরে ধীরে অন্য প্রকাশকদের যোগদান |
| ১৯৭৮ | বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার দায়িত্ব নেয় |
| ১৯৮৪ | নির্দিষ্ট নীতিমালায় "অমর একুশে গ্রন্থমেলা" নামে যাত্রা |
| ১৯৯৯ | ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা |
| ২০১৪ | মেলা সম্প্রসারিত হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত |
একটি মাদুর থেকে শুরু হয়ে আজ শত শত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, হাজার হাজার নতুন বই আর লাখো দর্শনার্থীর মাসব্যাপী উৎসব — এই যাত্রা নিজেই একটি অনুপ্রেরণার গল্প।
সাক্ষরতার অগ্রগতি: পরিসংখ্যানের চিত্র
বইমেলার সাফল্যের পাশাপাশি দেশের সাক্ষরতার হারেও এসেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী (সাত বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সীদের মধ্যে):
| সূচক | ২০১১ সালের শুমারি | ২০২২ সালের শুমারি |
|---|---|---|
| জাতীয় সাক্ষরতার হার | ৫১.৭৭% | ৭৪.৬৬% |
| শহরাঞ্চল | — | ৮১.২৮% |
| গ্রামাঞ্চল | — | ৭১.৫৬% |
| পুরুষ | — | ৭৬.৫৬% |
| নারী | — | ৭২.৮২% |
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ সাক্ষরতার হার ঢাকা বিভাগে (৭৮.০৯%) এবং সর্বনিম্ন ময়মনসিংহ বিভাগে (৬৭.০৯%)।
এক দশকে প্রায় ২৩ শতাংশ-বিন্দুর এই উল্লম্ফন একটি বড় অর্জন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়।
সাক্ষরতা বনাম পাঠাভ্যাস
অক্ষর চেনা আর বই পড়ার অভ্যাস এক জিনিস নয়। একজন মানুষ সাক্ষর হতে পারেন, অথচ সারা বছরে একটি বইও না পড়তে পারেন। শিক্ষাবিদেরা একে বলেন "অপাঠক সাক্ষরতা" — পড়তে পারা, কিন্তু না পড়া।
এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট ফর দ্য আর্টসের ২০২২ সালের জরিপে দেখা গেছে, সেখানে মাত্র ৪৮.৫% প্রাপ্তবয়স্ক আগের বছরে আনন্দের জন্য অন্তত একটি বই পড়েছেন। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল লিটারেসি ট্রাস্টের ২০২৪ সালের জরিপে মাত্র ৩৪.৬% শিশু-কিশোর বলেছে তারা অবসরে পড়তে ভালোবাসে।
অর্থাৎ, সাক্ষরতার লড়াই জেতার পরের লড়াইটি হলো পাঠাভ্যাসের লড়াই — এবং এটি একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ।
আলোকিত মানুষ গড়ার আন্দোলন
বাংলাদেশে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এটি প্রতিষ্ঠা করেন "আলোকিত মানুষ চাই" স্লোগান নিয়ে।
এর বইপড়া কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি এবং স্কুলভিত্তিক পাঠ-কার্যক্রম দেশের নানা প্রান্তে লাখো শিক্ষার্থীর কাছে বই পৌঁছে দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, বই হাতের নাগালে থাকলে এবং পড়ার একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি হলে মানুষ পড়ে।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশের পাঠসংস্কৃতির সামনে আজ কয়েকটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ:
- স্মার্টফোন ও সামাজিক মাধ্যমের প্রতিযোগিতা — বিশ্বের অন্য সব দেশের মতোই।
- পাঠ্যবইকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা — যেখানে "বাইরের বই" অনেক সময় সময়ের অপচয় হিসেবে দেখা হয়।
- গ্রামাঞ্চলে গ্রন্থাগারের সীমিত সুযোগ।
- বইমেলাকেন্দ্রিক মৌসুমি পাঠ — ফেব্রুয়ারিতে বই কেনা হয়, কিন্তু সারা বছর পড়া হয় কি?
আবার সম্ভাবনাও অনেক:
- ডিজিটাল গ্রন্থাগার ও ই-বুক প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিশাল সংগ্রহ পৌঁছে দিতে পারে।
- বাংলা ভাষায় ইন্টারনেটে মানসম্পন্ন লেখার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
- তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বই-আলোচনার অনলাইন গোষ্ঠী গড়ে উঠছে।
- একুশে বইমেলার মতো শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিত্তি ইতিমধ্যেই আছে।
যে জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দিতে জানে, সেই জাতির হাতে বই তুলে দেওয়া আমাদের সবচেয়ে বড় দায়।
শেষ কথা
চিত্তরঞ্জন সাহা যখন একটি আমগাছের নিচে মাদুর বিছিয়েছিলেন, তিনি হয়তো কল্পনাও করেননি যে একদিন সেটি হয়ে উঠবে একটি জাতির প্রাণের উৎসব। তাঁর সেই উদ্যোগ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: বড় পরিবর্তন শুরু হয় ছোট একটি পদক্ষেপ থেকে।
সাক্ষরতার লড়াইয়ে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। এবার সময় পাঠাভ্যাসের লড়াই জেতার — বছরে একটি মাস নয়, বারো মাস বইয়ের সঙ্গে থাকার। একুশের চেতনার সবচেয়ে সুন্দর উদযাপন হতে পারে প্রতিদিন একটু বাংলা পড়া।
তথ্যসূত্র
- বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো — জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২, প্রাথমিক প্রতিবেদন
- ইউনেস্কো — আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা (১৯৯৯)
- বাংলা একাডেমি ও দৈনিক পত্রিকাসমূহ — একুশে বইমেলার ইতিহাস বিষয়ক প্রতিবেদন
- ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট ফর দ্য আর্টস (২০২২) ও ন্যাশনাল লিটারেসি ট্রাস্ট (২০২৪) জরিপ
লেখাটা ভালো লাগলে একটা ভালোবাসা দিয়ে যান



